ঢাকা , বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬ , ২৮ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

​নিঝুম দ্বীপে মূল্যবান ভারী খনিজের সন্ধান

স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় : ১২-০৮-২০২৬ ০৭:৫৮:৪৫ অপরাহ্ন
আপডেট সময় : ১২-০৮-২০২৬ ০৭:৫৮:৪৫ অপরাহ্ন
​নিঝুম দ্বীপে মূল্যবান ভারী খনিজের সন্ধান ​ছবি: সংগৃহীত
বঙ্গোপসাগরের বুকে মেঘনা মোহনায় জেগে ওঠা নিঝুম দ্বীপের সৈকতের বালিতে বিপুল পরিমাণ মূল্যবান ভারী খনিজের সন্ধান পেয়েছেন গবেষকরা। সাম্প্রতিক খনিজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সৈকতের মোট পলির প্রায় ২৫ শতাংশই টোটাল হেভি মিনারেলস (THM)—যার মধ্যে রয়েছে শিল্প ও অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ জিরকন, রুটাইল, ইলমেনাইট, গার্নেট, সিলিম্যানাইট, কায়ানাইট, মোনাজাইট ও জেনোটাইম।

গবেষকদের মতে, নিঝুম দ্বীপের বালিতে এ ধরনের ভারী খনিজের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি বাংলাদেশের খনিজসম্পদ অনুসন্ধান ও শিল্পোৎপাদনে নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশেষ করে সিরামিক, রং, ধাতু প্রক্রিয়াজাতকরণ, ওয়েল্ডিং রডসহ বিভিন্ন শিল্পে ব্যবহৃত কাঁচামাল হিসেবে এসব খনিজের অর্থনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে।

নিঝুম দ্বীপে পাওয়া এই খনিজসমৃদ্ধ বালির বৈশিষ্ট্য বোঝার ক্ষেত্রে গঙ্গা–ব্রহ্মপুত্র–মেঘনা নদীব্যবস্থার পলি পরিবহনের ভূতাত্ত্বিক ইতিহাসও গুরুত্বপূর্ণ। হিমালয় থেকে বিপুল পরিমাণ পলি বহন করে গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র বাংলাদেশে এসে মেঘনা মোহনা দিয়ে বঙ্গোপসাগরে প্রবেশ করে। দীর্ঘ নদীপথ, মোহনা, বদ্বীপ ও সমুদ্রতলের বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এসব পলি পরিবাহিত ও পুনর্বিন্যস্ত হয়। সেই পলিরই একটি অংশ উপকূলীয় অঞ্চলে জমা হয়ে ভারী খনিজসমৃদ্ধ বালুর স্তর তৈরি করতে পারে।

গবেষণায় নিঝুম দ্বীপের সৈকতের বালু বিশ্লেষণ করে মোট পলির প্রায় এক-চতুর্থাংশে ভারী খনিজের উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়েছে। খনিজসমৃদ্ধ এই অংশের মধ্যে সিলিম্যানাইট, গার্নেট বা অ্যালমান্ডিন, জিরকন, রুটাইল, ইলমেনাইট, জেনোটাইম, মোনাজাইট এবং কায়ানাইটের মতো গুরুত্বপূর্ণ খনিজ পাওয়া গেছে।

এ ছাড়া অ্যামফিবোল ও পাইরক্সিন গ্রুপের বিভিন্ন খনিজও শনাক্ত হয়েছে।

গবেষণায় বালুর চৌম্বকীয় অংশেও একাধিক খনিজের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এর মধ্যে এনস্টাটাইটের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য। পাশাপাশি বায়োটাইট, পারগাসাইট, মাসকোভাইট, সোডালাইট, ডায়োপসাইড, ম্যাগনেসাইট, স্পিনেল, ট্রেমোলাইট, অ্যানোরথাইট, ম্যাগনেসিওফেরাইট, টাইটানাইট, পেরিক্লেস, স্পোডুমিন ও হর্নব্লেন্ডের মতো খনিজও চিহ্নিত করা হয়েছে।

অর্থাৎ নিঝুম দ্বীপের সৈকতের বালু শুধু সাধারণ নির্মাণসামগ্রী হিসেবে ব্যবহারের সম্ভাবনাময় নয়; বরং এর মধ্যে উচ্চমূল্যের শিল্পখনিজের একটি বৈচিত্র্যময় সমষ্টি রয়েছে।

বিভিন্ন খনিজ একই বালুর মধ্যে পাশাপাশি অবস্থান করায় এবং অনেক খনিজের ভৌত বৈশিষ্ট্য কাছাকাছি হওয়ায় প্রচলিত পদ্ধতিতে সেগুলো আলাদা করে শনাক্ত করা কঠিন। এ কারণে গবেষণায় উন্নত এক্স-রে ডিফ্র্যাকশন বা XRD প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে।

জাপানের তৈরি ‘স্মার্টল্যাব এসই (Rigaku)’ এক্স-রে ডিফ্র্যাক্টোমিটার দিয়ে বালুর নমুনা বিশ্লেষণ করা হয়। পরে ডিজিটাল ডেটা বিশ্লেষণের মাধ্যমে খনিজ শনাক্তকরণে ‘X'Pert HighScore Plus’ সফটওয়্যারের অটো-ম্যাচিং পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। এর মাধ্যমে নমুনায় থাকা বিভিন্ন খনিজের সুনির্দিষ্ট তালিকা তৈরি করা সম্ভব হয়েছে।

গবেষকদের মতে, এ ধরনের প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্লেষণ উপকূলীয় বালুর মধ্যে থাকা অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ শনাক্তকরণে আরও নির্ভুল তথ্য দিতে পারে।

বাংলাদেশের নদ-নদীর বালিতে আধুনিক শিল্প, বিশেষ করে সেমিকন্ডাক্টর খাতে প্রয়োজনীয় কাঁচামাল তৈরির সম্ভাবনাও যাচাই করা হয়েছে। দেশের আটটি প্রধান নদী ব্যবস্থার প্রায় ৫ হাজার ৪৮১ বর্গকিলোমিটার এলাকায় পরিচালিত জরিপে ৬ হাজার ৬০০টির বেশি নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে।

এর মধ্যে ৮০০টির বেশি নমুনার পেট্রো-মিনারেলজিক্যাল, রাসায়নিক ও ভৌত বিশ্লেষণ সম্পন্ন হয়েছে। এই বিশাল নমুনাভিত্তিক গবেষণার লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশের নদী ও উপকূলীয় পলিতে থাকা বিভিন্ন খনিজের প্রকৃতি, উৎস এবং শিল্পে ব্যবহারের সম্ভাবনা সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা পাওয়া।

গবেষকদের মতে, নদীবাহিত পলি শুধু ভূমি গঠনের উপাদান নয়; এর মধ্যে ভবিষ্যৎ শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন খনিজসম্পদও থাকতে পারে।

নিঝুম দ্বীপের বালিতে পাওয়া কয়েকটি খনিজ আন্তর্জাতিক শিল্পে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এর মধ্যে জিরকন, রুটাইল ও ইলমেনাইট অন্যতম।

জিরকন বিভিন্ন শিল্পে ব্যবহৃত হয় এবং ভূতাত্ত্বিক গবেষণায়ও এটি গুরুত্বপূর্ণ খনিজ হিসেবে পরিচিত। রুটাইল ও ইলমেনাইট টাইটানিয়ামসমৃদ্ধ খনিজ; এগুলো থেকে টাইটানিয়াম-ভিত্তিক শিল্পের কাঁচামাল পাওয়া যায়। রং, সিরামিক, ধাতু প্রক্রিয়াজাতকরণসহ বিভিন্ন শিল্পে এসব খনিজের ব্যবহার রয়েছে।

গার্নেট, সিলিম্যানাইট ও কায়ানাইটও শিল্পে গুরুত্বপূর্ণ। উচ্চ তাপমাত্রা সহ্য করার ক্ষমতার কারণে সিলিম্যানাইট ও কায়ানাইটের মতো খনিজ অবাধ্য বা refractory শিল্পে ব্যবহারের সম্ভাবনা রয়েছে। গার্নেট ঘর্ষণকারী উপাদানসহ বিভিন্ন শিল্পে ব্যবহৃত হয়।

অন্যদিকে মোনাজাইট ও জেনোটাইমের মতো খনিজও অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এগুলো বিরল মৃত্তিকা উপাদানসহ বিভিন্ন মূল্যবান উপাদানের উৎস হতে পারে।

গবেষণার বৃহত্তর ভূতাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট বলছে, বঙ্গোপসাগরের এই খনিজসমৃদ্ধ পলি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র নদ হিমালয় ও আশপাশের বিস্তীর্ণ ভূতাত্ত্বিক অঞ্চল থেকে বিপুল পরিমাণ শিলা ও খনিজ কণা সংগ্রহ করে বাংলাদেশে নিয়ে আসে।

প্রতি বছর শত শত মিলিয়ন টন পলি এই নদীগুলোর মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরে পৌঁছায়। নদীর পলি প্রথমে বদ্বীপ ও মোহনা অঞ্চলে জমা হয়। পরে জোয়ার-ভাটা, ঢেউ, ঘূর্ণিঝড় ও সমুদ্রতলের স্রোতের প্রভাবে পলি পুনরায় পরিবাহিত ও বাছাই হয়।

এই প্রক্রিয়ায় তুলনামূলক ঘন খনিজ কণাগুলো নির্দিষ্ট পরিবেশে জমা হওয়ার সুযোগ পায়। ফলে উপকূলীয় কিছু এলাকায় ভারী খনিজের ঘনত্ব সাধারণ নদীবালুর তুলনায় অনেক বেশি হতে পারে।

গবেষণায় দেখা গেছে, বঙ্গীয় শেলফের পলি ও গভীর সমুদ্রের পলিতে ব্রহ্মপুত্রের প্রভাব তুলনামূলকভাবে বেশি। বিশেষ করে বালুর ক্ষেত্রে ব্রহ্মপুত্রের অবদান অন্তত দুই-তৃতীয়াংশ হতে পারে বলে গবেষণায় ধারণা করা হয়েছে। তবে সূক্ষ্ম সিল্ট ও কাদামাটির ক্ষেত্রে গঙ্গার অবদানও গুরুত্বপূর্ণ।

নিঝুম দ্বীপের বালিতে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত ভারী খনিজের উপস্থিতি নিঃসন্দেহে সম্ভাবনাময়। তবে শুধু কোনো এলাকায় ভারী খনিজের উচ্চ ঘনত্ব পাওয়া গেলেই সেটিকে সরাসরি বাণিজ্যিক খনিজ মজুদ হিসেবে ঘোষণা করা যায় না।

বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলনের আগে প্রয়োজন হবে মজুদের প্রকৃত পরিমাণ, বিস্তৃতি, গভীরতা, খনিজগুলোর পৃথক ঘনত্ব, উত্তোলনযোগ্যতা, প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যয় এবং পরিবেশগত প্রভাব নির্ধারণ। বিশেষ করে নিঝুম দ্বীপ একটি উপকূলীয় দ্বীপ হওয়ায় এর সৈকত ও জীববৈচিত্র্যের ওপর খনিজ উত্তোলনের সম্ভাব্য প্রভাবও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।

তবে প্রাথমিক গবেষণার ফলাফল বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে। এত বেশি পরিমাণে মূল্যবান ভারী খনিজের উপস্থিতি নিশ্চিত হলে ভবিষ্যতে দেশীয় শিল্পের কাঁচামাল আমদানিনির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি নির্বাচিত খনিজ প্রক্রিয়াজাত করে রপ্তানির সুযোগও তৈরি হতে পারে।

গবেষকদের মতে, নিঝুম দ্বীপের মতো উপকূলীয় অঞ্চলের খনিজসমৃদ্ধ বালুর ওপর আরও বিস্তৃত ও পদ্ধতিগত অনুসন্ধান চালানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে দেশের প্রধান নদী ও বদ্বীপ অঞ্চলের পলির খনিজ সম্পদকে একটি সমন্বিত ভূতাত্ত্বিক জরিপের আওতায় আনা গেলে বাংলাদেশের অজানা শিল্পখনিজ সম্পদের একটি বড় চিত্র সামনে আসতে পারে।

বঙ্গোপসাগরের পলি তাই শুধু নদী থেকে বয়ে আসা মাটি নয়—এর মধ্যেই লুকিয়ে থাকতে পারে ভবিষ্যৎ শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল। নিঝুম দ্বীপের বালিতে ২৫ শতাংশ ভারী খনিজের সন্ধান সেই সম্ভাবনাকেই নতুন করে সামনে এনেছে।

বাংলা স্কুপ/বিশেষ প্রতিবেদক/এইচবি/এসকে


প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স



 

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ